চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর ধানমন্ডিতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজকে হাসপাতালে নেওয়ার হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন তার সহপাঠী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, ফাইয়াজের বুকে গুলি লেগেছিল। তাকে রিকশা থেকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নেন তারা। কিন্তু তাকে বাঁচানো গেল না।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার সাক্ষ্য রেকর্ড করা হয়। মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
নিরাপত্তার স্বার্থে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তিনি একটি মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। ওই দিন তাদের ওপর হামলা চালান ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। এতে আহত হয়ে অনেকেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু হাসপাতালেও হামলা চালানো হয়। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমিও আন্দোলনে অংশ নেই। ১৮ জুলাই সকাল ৯টায় বাসা থেকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য আসাদ গেটের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। আসাদ গেটে পৌঁছানোর পর আন্দোলনকারী ছাত্রদের দেখে ধাওয়া করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সকাল সাড়ে ১০টায় জড়ো হন আন্দোলনকারীরা। কিছুক্ষণ পর পুনরায় ধাওয়া করা হয়। পুলিশও টিয়ারশেল ছুড়লে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা চলতে থাকে।
এই শিক্ষার্থী বলেন, ওই দিন দুপুর ১টার দিকে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীরা মারণাস্ত্র হাতে নিয়ে আমাদের ধাওয়া করতে থাকেন। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের বিভিন্ন অলি-গলিতে চলে যাই। একপর্যায়ে কোনো এক গলির ফুটপাতে আমি বসে পড়ি। তখন দেখি আমার সহপাঠী ফারহান ফাইয়াজের বুকে গুলি লেগেছে। তাকে চারজন মিলে রিকশায় তুলছিলেন। ওই সময় আমিও এগিয়ে যাই। একই সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে থাকি।
এর মধ্যে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ফাইয়াজকে ধানমন্ডির সিটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরে তাকে আইসিইউতে নেন চিকিৎসকরা। ওই সময় নিজর সঙ্গে থাকা আইডি কার্ড সহপাঠীর কাছে দেন ফাইয়াজ। পরে তার বাবাকে ফোন দিয়ে গুলিবিদ্ধের খবর জানানো হয়। এরপর মামা ও মামিকে হাসপাতালে পাঠান ফাইয়াজের বাবা।
সাক্ষী আরও বলেন, ফাইয়াজের মামা-মামির কাছে তার আইডি কার্ডটি বুঝিয়ে দেই। এ ছাড়া, ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বাসায় চলে যাই। পরে তার মৃত্যুর খবর পাই। এ নিয়ে কিছু ভিডিও ও পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ বজলুর রহমান, সেন্টু, আজিজুল হক, যুবলীগের আহাদ হোসেন সোহাগ, ফজলে রাব্বী, ছাত্রলীগের রিয়াজ মাহমুদ হৃদয়, সাজ্জাদ হোসেনরা এ হামলা চালিয়েছেন। ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও বিপ্লব কুমার আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি তার। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চান।
এ মামলায় ২৮ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার চারজন হলেন— নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহ সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক ও যুবলীগ কর্মী ফজলে রাব্বি।
পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশুনুল হক, এমএ সাত্তার, তোফায়েল, তারেকুজ্জামান, আরিফুর রহমান তুহিন, আহাদ হোসাইন, মো. ইউনূস, মোল্লা রুবেল, আজিজুল হক, রিয়াজ মাহমুদ, হৃদয়, মাইনুল ইসলাম, শেখ বজলুর রহমান, জহির উদ্দিন, আয়মান, সেন্টু মিয়া ও ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার ও তারেক আবদুল্লাহ।
খুলনা গেজেট/এএজে

